জীবন সঙ্গীত কবিতার মূলভাব ও ব্যাখা

জীবন সঙ্গীত কবিতার মূলভাব  

‘জীবন-সঙ্গীত’ কবিতায় কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় মানবজীবনের প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান দান করেছেন। তিনি কবিতায় আমাদের জীবনের কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ ও সচেতন করে অনুবাদ তুলতে চেয়েছেন। আমাদের জীবনের নানা স্বপ্ন, প্রেম-ভালােবাসা, পরিবার গঠন, সংসারের নানা যন্ত্রণায় কাতরতা, হতাশা-নিরাশায় ভােগা, জীবনবিমুখ হয়ে ওঠা ইত্যাদি সম্পর্কে তার মতামত তুলে ধরেছেন। আর তা থেকে পরিত্রাণের জন্য মহাজ্ঞানীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, আপন কর্তব্য, যথাযথভাবে পালন করে জীবন সার্থক করে গড়ে তুলতে বলেছেন। কারণ মানব-জন্ম অত্যন্ত মূল্যবান। মিথ্যা সুখের কল্পনা করে জীবনের দুঃখ বাড়ানাে ঠিক নয়, জীবনের উদ্দেশ্যও তা নয়। কাজেই পদ্মপাতার শিশিরবিন্দুর মতাে ক্ষণস্থায়ী জীবনকে যত বেশি স্বপ্ন, সাধ, কর্মে, হাসি-আনন্দে, সাহসে-সংগ্রামে ভরে তােলা যায় ততই তা সার্থকতা লাভ করে। মানবজীবন ক্ষণস্থায়ী। এই ক্ষণস্থায়ী জীবনকে সার্থক করে তােলা যায় জগতের কল্যাণকর কাজের মাধ্যমে। মানুষকে এ পৃথিবীতে সাহসী যােদ্ধার মতাে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হবে। মহাজ্ঞানী ও মহান ব্যক্তিদের পথ অনুসরণ করে আমাদেরও বরণীয় হতে হবে। ‘জীবন-সঙ্গীত’ কবিতার এই মৌলিক বিষয়টিই শাশ্বত ।

জীবন সঙ্গীত কবিতার ব্যাখা

▶ বলাে না কাতর স্বরে বৃথা জন্ম এ সংসারে

এ জীবন নিশার স্বপন,

দারা পুত্র পরিবার, তুমি কার কে তােমার

বলে জীব করাে না ক্রন্দন

মানব-জনম সার, এমন পাবে না আর।

বাহ্যদৃশ্যে ভুলাে না রে মন,

কর যত্ন হবে জয়, জীবাত্মা অনিত্য নয়,

ওহে জীব কর আকিঞ্চন।

ব্যাখাঃ ‘জীবন-সঙ্গীত’ কবিতায় কবি হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় জীবনের প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেছেন। তিনি মানবজীবনের কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ ও সচেতন করেছেন এই বলে যে, মানুষের জীবন নিছক কোনাে স্বপ্ন নয়। পৃথিবীও মায়ার জগৎ নয়, মানুষ তা ভেবে শুধু কষ্ট পায়। স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, পরিবার-পরিজন কেউ কারও নয়- এমন ধারণা মিথ্যা। কারণ প্রত্যেকেরই পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে। কাজেই নিজের জন্মকে দোষ দেওয়া, অসার মনে করা উচিত নয়। জগতের চাকচিক্যে ডুবে থাকলেও চলবে না। আবার মৃত্যুকে  অনিবার্য জেনে জীবনবিমুখ হলেও চলবে না। জীবনের প্রতি যত্নবান। হতে হবে। কারণ মানব-জন্ম অত্যন্ত মূল্যবান।

▶ করাে না সুখের আশ, পরাে না দুখের ফাঁস,

জীবনের উদ্দেশ্য তা নয়,

সংসারে সংসারী সাজ, করাে নিত্য নিজ কাজ,

ভবের উন্নতি যাতে হয়।

ব্যাখাঃ মানুষের জীবনে সুখের পাশাপাশি থাকে দুঃখ। মিথ্যা সুখের আশায় জীবনে দুঃখ বাড়িয়ে লাভ নেই। অধিক সুখে গা ভাসিয়ে চলা বা দুঃখে বিষাদগ্রস্ত হওয়া জীবনের উদ্দেশ্য নয়। সুখ-দুঃখকে পাশ কাটিয়ে জীবনের উন্নতিকল্পে কাজ করাই জীবনের উদ্দেশ্য। কাজেই সংসারের দায়দায়িত্ব যথাযথ পালনের মাধ্যমে জগতের উন্নতি সাধন করতে হবে।

▶ দিন খায় ক্ষণ খায়, সময় কাহারাে নয়,

বেগে ধায় নাহি রহে শির,

সহায় সম্পদ বল, সকলি ঘুচায় কাল,

আয়ু যেন শৈবালের নীর।

ব্যাখাঃ সময় কারও জন্যই অপেক্ষা করে না। মুহূর্তের জন্যও সে থামে না, স্থির থাকে না, আপন নিয়মে প্রবাহিত হয়। মহাকালের সেই প্রবাহে ক্ষণবিন্দু মানুষের জীবন। অনন্ত প্রবাহিত সময়-ধারা থেকে যে সময়টুকু মানুষ তার জীবন রচনার জন্য পায় তা শৈবালের শিশরবিন্দুর মতাে ক্ষণস্থায়ী। জগতে যত সম্পদ, নাম, যশ, খ্যাতি সবই এই কালের হাতে বন্দি হয়ে পড়ে।

▶ সংসারে-সমরাঙ্গনে, যুদ্ধ কর দৃঢ়পণে,

ভয়ে ভীত হইও না মানব;

কর যুদ্ধ বীর্যবান,

যায় যাবে যাক প্রাণ

মহিমাই জগতে দুর্লভ।

ব্যাখাঃ জগৎসংসারে সাহসী যােদ্ধার মতাে জীবনসংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়তে হবে। ভয়ে আড়ষ্ট হলে চলবে না। বাঁচার মতাে বাঁচতে হবে, বাঁচার সংগ্রামে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতে হবে। তাতে প্রাণ গেলেও ক্ষতি নেই। কারণ জগতে ক্ষুদ্রকায়, হীন, দুর্বল হয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মহিমান্বিত হওয়া উচিত। তাতে জীবনের প্রকৃত মূল্য ও মর্যাদা লাভ হয়। কারণ মহিমাই জগতে সবচেয়ে মূল্যবান।

▶ মনােহর মূর্তি হেরে, ওহে জীব অন্ধকারে,

ভবিষ্যতে করাে না নির্ভর;

অতীত সুখের দিন, পুনঃ আর ডেকে এনে,

চিন্তা করে হইও না কাতর।

ব্যাখাঃ মানুষ বর্তমানকে অতিক্রম না করে ভবিষ্যতে যেতে পারে না। আর বর্তমানকে যদি ভালােভাবে কাজে লাগানাে না হয় তাহলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়। কাজেই বর্তমানকে কাজে না লাগিয়ে ভবিষ্যতের আশায় বসে থেকে ভালাে কিছু পাওয়ার চেষ্টা বৃথা । কারণ ঐরকম অপেক্ষা বােকামি এবং তা জীবনে দুঃখ বয়ে আনে। তারপরও মানুষ অতীত ও ভবিষ্যৎ নিয়েই বেশি কাতরতা প্রকাশ করে। প্রকৃতপক্ষে তা এক ধরনের বােকামি। মানুষের উচিত অতীতের সুখ আর ভবিষতের স্বপ্ন পরিহার করে জীবনকে বর্তমানমুখী করে তােলা।

Leave a Comment