কপোতাক্ষ নদ কবিতার মূলভাব ও ব্যাখা

কপোতাক্ষ নদ কবিতার মূলভাবঃ

‘কপােতাক্ষ নদ’ চতুর্দশপদী কবিতায় কবি যশােরের সাগরদাড়ির পাশ দিয়ে কুলকুল ধ্বনিতে বয়ে যাওয়া কপােতাক্ষের প্রতি তাঁর গভীর প্রেমবােধের পরিচয় দিয়েছেন। বিদেশি সাহিত্যে আত্মপ্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ কবি ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে স্বজনহীন জীবনযাত্রার মাঝে শৈশবকৈশােরের স্মৃতিবিজড়িত মাতৃরূপ কপােতাক্ষ নদকে স্মরণ করেছেন। তিনি সেখানে এ নদের মায়ামন্ত্র ধ্বনি শুনতে পেয়েছেন। কবি শুনতে পান কপােতাক্ষের কলকল ধ্বনি। তখন জন্মভূমির শৈশব-কৈশােরের বেদনা-বিধুর স্মৃতি তার মনে জাগিয়েছে কাতরতা। কবির মন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে কপােতাক্ষের তীরে ফিরে আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। কবি বহু দেশ ভ্রমণ করে, বহু নদ-নদীর জলে নৌকা ভাসিয়ে, জলে পিপাসা মিটিয়েও দুগ্ধ-স্রোতােরূপী কপােতাক্ষের জলের সেই স্বাদ পাননি। কারণ জন্মভূমির এই নদ যেন মায়ের স্নেহভােরে তাকে বেঁধেছে, কিছুতেই তিনি তাকে ভুলতে পারেন না। তার মনে সন্দেহ জাগে, এই নদের দেখা কি তিনি আর পাবেন? তাই তিনি প্রিয় নদের কাছে মিনতি করে বলেন- যদি কোনােদিন তিনি কপােতাক্ষের তীরে আর ফিরে যেতে নাও পারেন তবু যেন কপােতাক্ষ কবিকে মনে রাখে, বাংলার কোটি মানুষের কাছে তার কথা পৌছে দেয়; তাকে যেন সস্নেহে স্মরণ করে।      

 

কপোতাক্ষ নদ কবিতার ব্যাখাঃ

▶সতত, হে নদ, তুমি পড় মাের মনে!

সতত তােমার কথা ভাবি এ বিরলে;

ব্যাখাঃ কপােতাক্ষ নদ কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাগরদাড়ি গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদ। শৈশবের নানা স্মৃতি কবির মনে ভিড় করে। ফলে কবি যখন একান্ত নিরিবিলিতে থাকেন তখন এই নদের কথা ভাবেন। কপােতাক্ষের কথা সবসময় তার মনে পড়ে। প্রবাসে রূঢ় বাস্তবতায় কবি স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছেন। কপােতাক্ষের স্মৃতি তাকে ভাবিয়ে তুলেছে।

▶ সতত (যেমতি লােক নিশার স্বপনে

শশানে মায়া-মন্ত্রধ্বনি) তব কলকলে

জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে!

ব্যাখাঃ রাতে মানুষ যেমন ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে, মায়ামন্ত্র ধ্বনিতে আবেগে আপ্লুত হয়, কবিও অনুরূপভাবে কপােতাক্ষকে নিয়ে স্বপ্নে বিভাের  হন। স্বপ্নের মতাে কপােতাক্ষের সব সুখ-স্মৃতি তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তিনি নদের কলকল শব্দে বয়ে চলা অনুভব করেন। তিনি যেন স্বপ্নের ঘােরে কপােতাক্ষ নদের কলকল ধ্বনি শুনতে পান। 

▶ বহু দেশে দেখিয়াছি বহু নদ-দলে,

কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে?

ব্যাখাঃ প্রবাস জীবনে কবি বহু নদ-নদী দেখেছেন, কিন্তু আর কোনাে নদীর জল কপােতাক্ষের মতাে তৃপ্তি দিতে পারেনি। কারণ শৈশব- কৈশােরে কপােতাক্ষই ছিল তাঁর প্রাণসখা। এই নদের সৌন্দর্য অনুভব করে এর জলেই তার স্নেহের তৃষ্ণা মিটেছে। বিদেশের কোনাে নদ-নদীর জলে কিংবা সৌন্দর্যে কবির সে তৃষ্ণা মেটেনি। 

▶ দুগ্ধ-সােতােরূপী তুমি জন্মভূমি-স্তনে।

ব্যাখাঃ প্রবাস জীবনে কবি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছেন তাঁর জন্মভূমির  রূপসৌন্দর্যকে। কবির স্বদেশানুরাগটি মূলত কপােতাক্ষ নদকে কেন্দ্র করে ফুটে উঠেছে। তিনি জন্মভূমির এই নদীর জলকে মাতৃদুগ্ধের সঙ্গে তুলনা করেছেন। প্রবাসজীবনের স্নেহহীন দুঃসময় কবির মনে যখন গভীর বেদনা সৃষ্টি করেছে, কপােতাক্ষ নদের টলটলে স্বচ্ছ স্রোতধারা তখন কবির কল্পনায় ভূমিমাতার দুধের ফোয়ারা হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।

▶ আর কি হে হবে দেখা?- যত দিন যাবে,

ব্যাখাঃ কবি স্বদেশ ছেড়ে প্রবাসে গিয়ে শৈশব-স্মৃতিতে কাতর হয়ে পড়েছেন। বাস্তবতায় ফিরে এসে তার মনে জেগেছে নানা সন্দেহ, সংশয়। হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা কপােতাক্ষ নদের সঙ্গে পুনরায় তার দেখা হওয়া নিয়েও সংশয়ের শেষ নেই। তিনি কি আবার সেই শৈশব-কৈশােরের স্মৃতি জড়ানাে কপােতাক্ষ নদকে দেখতে পাবেন?

▶ প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে

বারি-রূপ কর তুমি; এ মিনতি, গাবে

বঙ্গজ জনের কানে, সখে, সখা-রীতে

নাম তার, এ প্রবাসে মজি প্রেম-ভাবে

ব্যাখাঃ কবি জানেন যে তাঁর শৈশবের নদটি আগের মতােই সাগরকে বারিরূপ (জল) কর দিয়ে যাচ্ছে। প্রজা যেমন রাজাকে কর বা রাজস্ব দেয়, তেমনি কপােতাক্ষ নদও সাগরকে জলরূপ কর বা রাজস্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের কানে কানে কররূপ সেই স্রোতধারা কলকল ধ্বনিতে সাগরের বুকে ছুটে চলছে। কপােতাক্ষ নদ যেন কবিকে স্নেহাদরে বন্ধু ভাবে। প্রেমভাবে যেন তাকে স্মরণ করে। কারণ কবি তাকে গভীর আবেগ, ভালােবাসায় স্মরণ করেছেন।

▶ লইছে যে তব নাম বঙ্গের সংগীতে।

কবি শুধু জন্মভূমির প্রিয় নদকেই স্মরণ করেন না, কপােতাক্ষ নদ যে তার স্বদেশের জন্য হৃদয়ের কাতরতা তাও তিনি বঙ্গবাসীর কাছে ব্যক্ত করেছেন। প্রবাসজীবনেও তিনি গানে, কবিতায়, শৈশবে-কৈশােরের স্মৃতিবিজড়িত নদের কথা লিখেছেন। তাঁর প্রিয় নদের নাম বঙ্গের সংগীতে রূপান্তরিত।   

Leave a Comment